চীনের ওপর নতুন করে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এ ঘোষণার পর শুক্রবার বড় ধস নেমেছে ওয়াল স্ট্রিটে। প্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতের শেয়ারের দামে ব্যাপক পতন দেখা যায়। এপ্রিলের পর এটি যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের একদিনের সবচেয়ে বড় পতন। খবর এপি।
সাপ্তাহিক লেনদেনের শেষ দিন শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ার সূচকগুলোয় শুরুতে সামান্য ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছিল। তবে ট্রাম্পের বার্তার পর পরই সূচকগুলো দ্রুত নিম্নমুখী হয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, ‘আমরা চীনা আমদানিতে শুল্ক ব্যাপকভাবে বাড়ানোর কথা ভাবছি।’
চীনের বিরল খনিজ রফতানিতে কড়াকড়ি আরোপে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এ খনিজগুলো ভোক্তা ইলেকট্রনিকস থেকে শুরু করে জেট ইঞ্জিন তৈরিতেও অপরিহার্য। ট্রাম্প বলেন, ‘অন্যান্য দেশ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তারা হঠাৎ শুরু হওয়া এ বাণিজ্য বৈরিতায় ক্ষুব্ধ। দক্ষিণ কোরিয়া সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও এখন এর কোনো প্রয়োজন দেখছি না।’
ট্রাম্পের মন্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা আবার বেড়ে যায়। এর প্রভাবে ওয়াল স্ট্রিটে লেনদেন হওয়া প্রায় সাতটির মধ্যে ছয়টি কোম্পানির শেয়ার সূচক কমে যায়। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সবখানেই পতন দেখা যায়।
এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক শুক্রবার ২ দশমিক ৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৫৫২ দশমিক ৫১ পয়েন্টে। এপ্রিলের পর এটি সূচকটির এক দিনের সর্বোচ্চ পতন। ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ কমেছে ৮৭৮ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৯ শতাংশ, দিনশেষে যা স্থির হয় ৪৫ হাজার ৪৭৯ দশমিক ৬০ পয়েন্টে। নাসডাক কম্পোজিট সূচক ৩ দশমিক ৬ শতাংশ কমে নেমেছে ২২ হাজার ২০৪ দশমিক ৪৩ পয়েন্টে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত কয়েক মাসে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক টানা প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছিল। ফলে শেয়ারদর এখন অনেক বেশি ‘অতিরিক্ত মূল্যায়িত’ অবস্থায় পৌঁছেছে। তাই বিনিয়োগকারীরা এমনিতেই কিছুটা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। ট্রাম্পের ঘোষণায় সে উদ্বেগ তীব্র হয়ে ওঠে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের শেয়ারে অতিরিক্ত মূল্যায়ন নিয়ে নতুন করে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, এর সঙ্গে ২০০০ সালের ‘ডটকম বাবলের’ মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
প্রযুক্তি খাতের বড় কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারদরেও চাপ পড়েছে। জিন্স নির্মাতা লিভাই স্ট্রসের শেয়ারদর একদিনে কমেছে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। যদিও কোম্পানিটি প্রান্তিক মুনাফায় বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা ছাড়িয়ে গেছে। বছরের শুরু থেকে কোম্পানিটির শেয়ারদর ৪২ শতাংশ বেড়েছিল। তাই বিনিয়োগকারীদের মুনাফা তুলে নেয়ার প্রবণতাও বাজারে প্রভাব ফেলেছে।
শুক্রবারের বড় পতনে একদিনেই এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক হারিয়েছে ১৮২ দশমিক ৬০ পয়েন্ট। বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক উত্থানের পর এবার তা কিছুটা সংশোধনের পর্যায়ে এসেছে।
বন্ডবাজারেও পতন দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে, যা আগের দিন ছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। ট্রাম্পের মন্তব্যের আগেই এটি কিছুটা কমেছিল। কারণ মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, উচ্চমূল্য ও চাকরির অনিশ্চয়তা নিয়ে ভোক্তাদের আস্থা দুর্বল।
জরিপের পরিচালক জোয়ান সু বলেন, ‘উচ্চমূল্য আর চাকরির সুযোগ কমে যাওয়া এখনো ভোক্তাদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়। তারা নিকট ভবিষ্যতে এসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখছেন না।’
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন চাকরির সুযোগ ও নিয়োগের হার এখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) গত মাসে চলতি বছরের প্রথম সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ফেড কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী বছরও ধীরে ধীরে আরো সুদহার কমানো হতে পারে। তবে চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল সতর্ক করে বলেছেন, মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলে নীতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। কারণ সুদহার কমালে পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়ে, আর তাতে মূল্যস্ফীতি আবারো বাড়তে পারে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক জরিপে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিতও মিলেছে। আগামী এক বছরের মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশা সামান্য কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬, যা আগের মাসে ছিল ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। যদিও হারটি এখনো বেশি, তবে কিছুটা কমায় ফেডারেল রিজার্ভের জন্য এটি স্বস্তির খবর হতে পারে।
আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারে শুক্রবার ছিল মিশ্র ধারা। ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে বেশির ভাগ সূচকেই পতন দেখা গেছে। ফ্রান্সের সিএসি ৪০ সূচক কমেছে ১ দশমিক ৫, আর হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক কমেছে ১ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক বেড়েছে ১ দশমিক ৭ শতাংশ। ছুটির পর লেনদেন শুরু হওয়ায় সেখানকার বাজারে কিছুটা ইতিবাচক সাড়া দেখা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের নতুন শুল্ক হুমকি বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা নড়বড়ে হয়েছে। তারা বলছেন, পরবর্তী ফেড বৈঠক, করপোরেট আয়ের তথ্য এবং মার্কিন রাজনৈতিক পরিস্থিতি—এসবই আগামী সপ্তাহে শেয়ারবাজারের দিক নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।